শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তার স্ত্রী ফার্স্ট লেডি ব্রিজিত ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি পডকাস্টার ক্যান্ডেস ওউন্সের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। বুধবার (২৩ জুলাই) ডেলাওয়্যার সুপিরিয়র কোর্টে দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ‘ব্রিজিত একজন পুরুষ’—এমন ভুয়া দাবি প্রচারের মাধ্যমে ওউন্স একটি পরিকল্পিত মানহানিকর প্রচারণা চালিয়েছেন।
মামলায় বলা হয়, ওউন্স তার ইউটিউব পডকাস্ট সিরিজ বিকামিং ব্রিগেট (Becoming Brigitte) এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিকবার দাবি করেছেন যে ব্রিজিত ম্যাক্রোঁ আসলে জন্মেছিলেন পুরুষ হিসেবে, যার নাম ছিল ‘জ্যঁ-মিশেল ট্রোগনু’। যদিও ম্যাক্রোঁ দম্পতির বক্তব্য অনুযায়ী, এটি তার বড় ভাইয়ের নাম এবং এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যান্ডেস ওউন্স ম্যাক্রোঁ দম্পতির ব্যক্তিজীবন, চেহারা, বৈবাহিক সম্পর্ক, বন্ধু-বান্ধব, পরিবারসহ নানা বিষয় খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে সেগুলোর বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে অপমানজনক একটি কাহিনি তৈরি করেছেন। এতে বলা হয়, ‘এই প্রচারণা বিশ্বব্যাপী আমাদের হয়রানির মুখে ফেলেছে।’
এদিকে, মামলার জবাবে ওউন্স তার পডকাস্টে বলেন, মামলায় ‘অনেক তথ্যগত ভুল রয়েছে’ এবং এটি তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি রাজনৈতিক অপচেষ্টা। তিনি জানান, মামলার বিষয়ে কোনো পূর্বধারণা ছিল না, যদিও উভয় পক্ষের আইনজীবীরা জানুয়ারি থেকেই যোগাযোগে রয়েছেন। ওউন্সের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এই মামলা একজন আমেরিকান স্বাধীন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিদেশি সরকারের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা।’
অন্যদিকে, ম্যাক্রোঁ দম্পতির আইনজীবীদের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তারা এর আগেও তিনবার ওউন্সকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানহানিকর বক্তব্য প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিলেন, তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ওউন্স ইচ্ছাকৃতভাবে এসব দাবি ছড়িয়েছেন আমাদের এবং আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অপমানজনক উদ্দেশ্যে।’
এ মামলাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একজন রাষ্ট্রপ্রধান ও তার স্ত্রী সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মানহানির অভিযোগ আনলেন, যেখানে এই ধরনের মামলায় প্রমাণের জন্য কঠোর আইনি মানদণ্ড, যেমন ‘অ্যাকচুয়াল ম্যালিস’ (উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচার) পূরণ করতে হয়।
মামলার কেন্দ্রে রয়েছে ক্যান্ডেস ওউন্সের আট পর্বের পডকাস্ট সিরিজ বিকামিং ব্রিগেটি, যা ইউটিউবে ইতোমধ্যে ২৩ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। মামলায় এই সিরিজ এবং এক্স (সাবেক টুইটার)-এ প্রকাশিত পোস্টগুলোকে মানহানিকর এবং ‘যাচাইযোগ্য মিথ্যা ও ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়, ব্রিজিত ম্যাক্রোঁ লিঙ্গ পরিবর্তনের মাধ্যমে নারী হয়েছেন, তিনি অন্যজনের পরিচয় চুরি করেছেন এবং ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে তার রক্তসম্পর্ক ছিল—যা থেকে ইনসেস্টের অভিযোগ তোলা হয়।
তবে অভিযোগপত্রে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যখন স্কুলছাত্র ছিলেন তখন ব্রিজিত ছিলেন তার শিক্ষিকা, এবং তাদের সম্পর্ক আইনগত সীমার মধ্যে ছিল।
এই বিতর্কিত গুজবের সূত্রপাত ঘটে ২০২১ সালে, যা পরে ডানপন্থি মার্কিন পডকাস্টার টাকার কার্লসন ও জো রগানের শোতেও আলোচনায় আসে। উল্লেখ্য, এ দুই পডকাস্টার ডানপন্থি শ্রোতাদের মধ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
এর আগেও ব্রিজিত ম্যাক্রোঁ ফ্রান্সে তার লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে মানহানির মামলায় জয় লাভ করেছিলেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিসের এক আদালত দুই নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে। তবে চলতি মাসে আপিল আদালত সেই রায় বাতিল করেছে, এবং এখন ব্রিজিত ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে এমন মামলা আরও রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০ বিলিয়ন ডলারের এক মানহানি মামলায় ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, যেখানে দাবি করা হয় তিনি জেফরি অ্যাপস্টেইনের জন্মদিনে অশালীন শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন। যদিও জার্নাল জানিয়েছে, তারা তাদের প্রতিবেদনের পক্ষে অবস্থান নেবে।
এছাড়া, গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প ডিজনির মালিকানাধীন এবিসি নিউজের সঙ্গে ১৫ মিলিয়ন ডলারে সমঝোতায় পৌঁছান—যেখানে ভুলভাবে দাবি করা হয়েছিল যে তাকে ধর্ষণের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যদিও তা ছিল একটি বেসামরিক মামলার যৌন নিপীড়নের অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে, ব্রিজিত ম্যাক্রোঁর মামলাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং এক আন্তর্জাতিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে—যেখানে অনলাইন তথ্যযুদ্ধ ও ‘ফ্যাক্ট-চেকহীন’ কনটেন্টের বিরুদ্ধে বিশ্বনেতারাও এখন আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন।