লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ সিদ্দিকীঃ
আজ আমাকে লিখতেই হবে একজন জামায়াত নেতার কর্মজীবন। তিনি আর কেউ নয়, যাকে সবাই জানেন জামাতের নাসের সাহেব নামে। তিনি একজন নিরহংকার মানুষ, একটি ইতিহাস ও দেশগড়ার এক হিডেন কারিগর। আছেন প্রচারবিমুখ আড়ালে আবডালে মানব সেবার নেপথ্য নায়ক।
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কাঁকড়া ইউনিয়নের মাওলানা আহমদ উল্লাহ সাহেবের তৃতীয় সন্তান আবু নাছের মোঃ আব্দুজ্জাহের। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাবল মাস্টার্স ছাত্র জীবনে ইসলামী ছাত্রসংঘের ১৯৭০/৭১ চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৭ সাল নাগাদ নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। এরপর নারায়নগঞ্জ কলেজের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ঢাকার সৌদি দূতাবাসের সচিব পদে যোগদান করেন।
বাংলাদেশের প্রথম সৌদি রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আব্দুল হামিদ আল খতিব সাহেবের একান্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারের সময়ে এই নাসের সাহেবের হাত ধরে শত শত বাংলাদেশী শ্রমিক ঐ দেশের বিভিন্ন সেক্টরে সরকারী চাকরীতে যোগদান করেন। এই সকল শ্রমিকদের বিদেশ যেতে কোনো অর্থ খরচ করতে হয়নি। তখনকার আশ্চর্যের বিষয় ছিলো কোম্পানীগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা মুসা মিয়াকে বিনা টাকায় বিদেশ প্রেরন, মুক্তিযোদ্ধা নাসেরকে আর্থীক অনুদানের কথা ভুলার মতো নয়। ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সকল রাজনৈতিক দলের মতোই জামায়াত ইসলামী রাজনীতিতে তৎপর হতে শুরু করে।
একটি ভংগুর রাজনৈতিক দলের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নাসের সাহেব উদ্ধতনদের পরামর্শ, আপন চিন্তা ও পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ওমরাহ পালনে মক্কায় গমন করেন। কয়েক সহস্রাধিক কর্মিদের জানান দিলেন তাঁর ওমরাহ পালনের বিষয়টি। সবাইকে হারাম শরীফের আজান খানার নিচে জড়ো করে এক জ্বালাময়ী নসিহত করলেন। এই সকল কর্মিরা যেহেতু তাঁর কোনো আত্বীয় বা এলাকার ছিলোনা তবে সবাই বিনা খরচে এই সুযোগ পাওয়ায় উপস্থিত সকলকে নিয়ে মুনাজাত করলেন এবং স্বরন করিয়ে দিলেন তিনি আল্লাহর খুশির জন্যই এমন উপকার করেছেন। সুতরাং সকলের ওয়াদা নিলেন আল্লাহর দ্বীনের জন্য ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ দান করতে। সকলেই সমস্বরে ঘোষনা দিলেন জামায়াতে ইসলামীর তহবিলে মাসিক এয়ানত দান করবেন। এই দিন থেকেই জামায়াতে ইসলামীর তহবিল সচল হতে থাকে। পর্যায়ক্রমে সৌদিতে লোক নিয়োগ চলমান থাকায় দলের দাওয়াতি কাজ বৃদ্ধি পেতে লাগলো। কখনো কখনো সৌদি প্রবাসীদের নিজস্ব এয়ানতের এককালীন অনুদানের টাকায় ঢাকার আল ফালাহ প্রিন্টিং, কেন্দ্রীয় কার্যালয়, মহানগর কার্যালয় খরিদ করতে সাহায্য করে। এমনকি নির্বাচনের এককালীন ওয়াদায় প্রবাসীদের অর্থই হয়ে উঠে নির্বাচনী ফান্ড। কালের পরিক্রমায় ইসলামী ব্যাংক শেয়ার খরিদ, দিগন্ত মিডিয়া, বাংলাদেশ প্রকাশনী সহ অসংখ্য পরিকল্পনার সূতিকাগার সৌদির এই এয়ানত বা বায়তুলমাল তহবিল।
সৌদিতে লেবার নিয়োগের প্রেক্ষিতে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক মেডিকেল চেকআপ করতে হয় নানান হাসপাতালে। ১৯৮১ সালের কোনো একদিন জনাব নাসের সাহেব সৌদি দূতাবাসের বরাদ্দ কৃত নিজের বাসস্থানের বৈঠকখানার পার্টিশান করে ২/১ জন টেকনিশিয়ান ও একজন ক্যাশিয়ার নিয়োগ দিয়ে তিনি মেডিকেল চেকআপ চালু করলে মাননীয় রাষ্ট্রদূত নিজেই সহযোগিতা করে একটি পূর্ণাঙ্গ চেকআপ সেন্টার " ইবনেসীনা " নাম করন করেন যাহা দেশব্যাপী আজকের ইবনেসীনা গ্রুপ। যার ব্রাঞ্চ সংখ্যা সারাদেশে শত শত। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফার্মিসিটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, ও ডায়োগনেষ্টিক সেন্টার।
চালু করা হলো সারাদেশে ইসলামী ভাবধারা ও ইংলিশ মিডিয়াম অসংখ্য কেজি স্কূল, কলেজ, পলিটেকনিক ও বিশ্ববিদ্যালয়। ইসলামী ব্যাংকের শত শত ব্রাঞ্চ জনগনের কল্যাণে কাজ করছে। এই সকল কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে মরহুম মোহাম্মদ ইউনুস রঃ, শহীদ মীর কাশেম আলী রঃ, কমোডর আতাউর রহমান, মরহুম শাহ আবদুল হান্নান রঃ, সহ পরবর্তীতে অনেকেই ভুমিকা রাখেন। প্রবাস থেকে জনাব শহীদুল ইসলাম মাক্কি সহ আমরা কাজের যোগান দিয়েছি।
নিচের ছবিটি সৌদি আরবের জেদ্দায় হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের। তিনি তখন ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নির্বাচিত। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি বললেন এক ঐতিহাসিক অজানা ঘটনার কাহিনী।
সময়টি ছিলো শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমল। শ্রমমন্ত্রী ও বিমানমন্ত্রী ছিলেন মরহুম এস এ বারী এটি (এটি বারী) তখনো আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তেজগাঁও। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কুর্মিটোলা বিমানবন্দর নির্মাণের হাত দিয়েছেন কিন্তু সরকারের তেমন ফান্ড না থাকায় সৌদি সরকারের আর্থীক অনুদানের একটি পরিকল্পনা পেশ করা হলো। রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আল খাতিব সাহেব আশ্চর্যের সাথে হাসি দিয়ে নাসের সাহেবকে বললেন আন্তর্জাতিক মানের এয়ারপোর্টের এই সামান্য বাজেট?? তুমি সরকারের কতৃপক্ষের সাথে কথা বলো। নাসের সাহেব কাল বিলম্ব না করে ফাইলে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে সাবমিট করতে। পরবর্তীতে প্রায় চারগুন অর্থ বরাদ্দের আবেদন পাশ করিয়ে বিমানবন্দরে অবকাঠামো সম্পন্ন করা হয়।
আবু নাসের সাহেবরা ক্ষমতারোহন না করেই লোকচক্ষুর আড়ালে এই দেশকে অনেক কিছু দিয়েছে। তাঁকে সরিয়ে যুদ্ধাপরাধী বানিয়ে নির্বাসিত করে ব্যাংকটি লুটপাটের মহড়া চলেছে। তবুও তাঁরা তাঁরা বিদেশের দালাল রাষ্ট্রদ্রৌহি। আর চেতনা ব্যবসায়ীরা দেশপ্রেমিক। জনাব আবু নাসের সাহেব বর্তমানে বার্ধক্য অবস্থায় দেশেই আছেন। শুধু তাঁদের খেদমত থেকে ১৫ বছর দেশবাসীকে বন্চিত করা হলো। আর আজকের এই সময়ে দলের একমাত্র সিনিয়র এই অসুস্থ নেতার কর্ম, ত্যাগ, ভূমিকা, ইসলামী রাজনীতির শেকড় বিনির্মাণের ইতিহাস অনেকেই ভুলতে বসেছেন বলেই পরিলক্ষিত হয়।
হে আল্লাহ এই প্রচার বিমুখ নিঃস্বার্থ মহান এই মানুষটির সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
(লেখকঃ অতি কাছ থেকে দেখার সাক্ষী)
-----------------------------------------------------
(হাফিজ ছিদ্দিকী, মুক্তিযোদ্ধা)